আধুনিক প্রকাশনী ১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে বাংলা ভাষা ভাষী জন সংখ্যার মধ্যে ইসলাম প্রচারে বিশেষ ভূমিকা রেখে চলেছে।
Copyright©2025আধুনিক প্রকাশনী - all rights reserved. Technical support by LiberalSoft
ব্লগ এর বিস্তারিত
by Admin
2024-10-20
নেতৃত্বের ব্যাপারে আল্লাহর নিয়ম আমাদের এই চূড়ান্ত উদ্দেশ্য ও চরম লক্ষ্য বুঝে নেয়ার পর এই ব্যাপারে বিশ্ব স্রষ্টা আল্লাহ তায়ালার নিজস্ব নিয়ম-নীতি কি তাও জেনে নেয়া আবশ্যক। কারণ, আমাদের কোনো উদ্দেশ্য লাভ করতে হলে তা আল্লাহর নিয়ম অনুসারেই লাভ করা সম্ভব, তার বিপরীত নয়। আমরা যে বিশ্ব প্রকৃতির বুকে বসবাস করি, আল্লাহ তার একটি নির্দিষ্ট নিয়ম অনুযায়ীই এটা সৃষ্টি করেছেন। এখানকার প্রত্যেকটি দ্রব্য ও বস্তুই সেই স্থায়ী ও অটল নিয়ম বিধানের অনুসারী। কেবল সদিচ্ছা ও নেক বাসনার দরুনই এখানে চেষ্টা সাফল্য লাভ করতে পারে না। মহান পবিত্র আত্মাদের (?) বরকতেই এখানে কোনো বাসনা বাস্তবে রূপায়িত হতে পারে না। এই প্রাকৃতিক দুনিয়ায় মানুষের চেষ্টা-সাধনা ফলপ্রসু হওয়ার জন্য আল্লাহ নির্ধারিত নিয়ম অনুসরণ করে চলা অপরিহার্য। একজন কৃষক সে যতোবড় বুজুর্গ হোক, মহৎ গুণের আধার এবং তসবীহ পাঠে যতোই আত্মহারা হোক না কেন যতোক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ নির্ধারিত নিয়ম অনুসারে পরিপূর্ণ শ্রম সহকারে কৃষিকাজ সম্পন্ন না করবে ততোক্ষণ পর্যন্ত তার একটি বীজও অংকুরিত হতে পারে না। অনুরূপভাবে নেতৃত্ব বিপ্লবের সেই চরম উদ্দেশ্যও কখনো কেবল দোয়া, তাবীজ, সদিচ্ছা ও নেক বাসনার সাহায্যে লাভ করা যাবে না। রাষ্ট্র বিপ্লবের জন্য আল্লাহর নিয়ম অনুধাবন করা একান্ত আবশ্যক। কারণ, দুনিয়ার নেতৃত্ব কায়েম হওয়ার এটাই হচ্ছে স্বাভাবিক নিয়ম। এরই অধীন একজন লোক নেতৃত্ব লাভ করে এবং এ নিয়ম অনুযায়ীই এক-একজন লোক নেতৃত্ব হারায় বা নেতৃত্ব হতে বঞ্চিত হয়। এই সম্পর্কে আমার অন্যান্য রচনাবলীতেও আমি আলোচনা করেছি বটে; কিন্তু তা ছিলো সংক্ষিপ্ত আলোচনা। আজ এখানে যথাসম্ভব বিস্তারিতভাবে এই বিষয়টির বিশ্লেষণ করা দরকার বলে মনে করি। কারণ, এই বিষয়টি সম্পর্কে সুস্পষ্ট জ্ঞান ও পরিষ্কার ধারণা না হলে আমাদের কর্মপন্থা এবং চলার পথ আমাদের সম্মুখে উদ্ভাসিত হবে না। মানুষের গোটা সত্তার বিশ্লেষণ করে দেখলে নিঃসন্দেহে জানতে পারা যায় যে, এর মধ্যে দু’টি দিক পরস্পর বিরোধী হয়েও পরস্পর ওতপ্রোতভাবে জড়িত। মানুষের একটি দিক এই যে, তার একটি স্বাভাবিক প্রাকৃতিক ও পাশবিক সত্তা রয়েছে। তার এই সত্তার উপর ঠিক সেইসব নিয়ম ও আইন জারি হয়ে আছে, যা সমগ্র বস্তুগত ও জন্তু-জানোয়ারের উপর বর্তমান। দুনিয়ার অন্যান্য সমগ্র জড় পদার্থ ও জান্তব সত্তার কার্যকারিতা ও কর্মক্ষমতা যেসব যন্ত্রপাতি ও বৈষয়িক উপায়-উপাদান এবং জড় অবস্থার উপর একান্ত নির্ভরশীল, মানুষের এই দিকটির কার্যকারিতা ও কর্মক্ষমতা ও অনুরূপভাবে সেই সবেরই উপর নির্ভরশীল। মানুষের এই স্বাভাবিক (Physical) সত্তা তার যাবতীয় কর্মক্ষমতাকে একমাত্র প্রাকৃতিক নিয়মের অধীন যন্ত্রপাতি ও উপায়-উপাদানের সাহায্যে এবং স্বাভাবিক জড় অবস্থায় থেকেই ব্যবহার করতে পারে। এজন্যই তার সকল কাজের উপরই বাস্তব ও কার্যকারণ পরম্পরা জগতের সমগ্র শক্তিই বিপরীত কিংবা অনুকূল প্রভাব বিস্তার করে থাকে। মানুষের মধ্যে আর একটি দিক রয়েছে খুবই উজ্জ্বল এবং গুরুত্বপূর্ণ। তা হচ্ছে তার মানবিক দিক তার মানুষ হওয়ার দিক অন্য কথায় বলা যায়, মানুষের একটি নৈতিক দিক রয়েছে, যা কোনদিক দিয়েই প্রাকৃতিক সত্তার অধীন ও অনুসারী নয়। এই নৈতিক দিক নৈতিক সত্তাই মানুষের স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক দিকের উপর এক হিসেবে প্রভুত্ব বিস্তার করে। স্বাভাবিক ও জান্তব সত্তাকেও এটা অস্ত্র ও উপায় হিসেবে ব্যবহার করে থাকে। সেই সঙ্গে বহির্বিশ্বের কার্যকারণসমূহকেও নিজের অধীন করতে এবং নিজের উদ্দেশ্য সাধনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চেষ্টা করে। আল্লাহ তায়ালা মানুষের মধ্যে যেসব নৈতিক ও চারিত্রিক গুণপণা সৃষ্টি করে দিয়েছেন, তাই হচ্ছে এর কর্মচারী বা কার্যসম্পন্নকারী শক্তি। তার উপর প্রাকৃতিক নিয়মের কোনো প্রভুত্বই চলে না, চলে নৈতিক নিয়ম বিধানের প্রভুত্ব। মানুষের উত্থান-পতন নৈতিক চরিত্রের উপর নির্ভরশীল উল্লেখিত দু’টি দিক মানুষের মধ্যে ওতপ্রোতভাবে বিজড়িত রয়েছে। সমষ্টিগতভাবে তার সাফল্য ও ব্যর্থতা এবং তার উত্থান ও পতন বৈষয়িক বা বস্তুনিষ্ঠ ও নৈতিক এই উভয়বিধ শক্তির উপর একান্তভাবে নির্ভর করে। মানুষ না বস্তুনিষ্ঠ শক্তি নিরপেক্ষ হতে পারে, আর না নৈতিক শক্তির মুখাপেক্ষীহীন হয়ে কিছু সময় বাঁচতে পারে। তার উন্নতি লাভ হলে উভয় শক্তির ভিত্তিতেই হবে, আর পতন হলেও ঠিক তখনি হবে, যখন এই উভয়বিধ শক্তি হতেই সে বঞ্চিত হয়ে যাবে। অথবা এটা অন্যান্যের তুলনায় অপেক্ষাকৃত দুর্বল ও নিস্তেজ হয়ে পড়বে। কিন্তু একটু গভীর ও সুক্ষ দৃষ্টিতে চিন্তা করলে নিঃসন্দেহে বুঝতে পারা যাবে যে, মানব জীবনের মূল সিদ্ধান্তকারী গুরুত্ব রয়েছে নৈতিক শক্তির বৈষয়িক বা বস্তুনিষ্ঠ শক্তির নয়। বৈষয়িক বস্তুনিষ্ঠ উপায়-উপাদান লাভ, স্বাভাবিক পন্থাসমূহের ব্যবহার এবং বাহ্যিক কার্যকারণ পরম্পরাসমূহের আনুকূল্য সাফল্যলাভের জন্য অপরিহার্য শর্ত এতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। কাজেই মানুষ যতোদিন এই কার্যকারণ পরম্পরা জগতে বসবাস করবে, এই শর্ত কোনোরূপেই উপেক্ষিত হতে পারে না। কিন্তু এতদসত্ত্বেও যে মূল জিনিসটি মানুষের পতন ঘটায়, উত্থান দান করে এবং তার ভাগ্য নির্ধারণের ব্যাপারে যে জিনিসটির সর্বাপেক্ষা অধিক প্রভাব রয়েছে, তা একমাত্র নৈতিক শক্তি ভিন্ন আর কিছুই নয়। এটা সুস্পষ্ট যে, মানুষকে এর দেহসত্তা বা এর পাশবিক দিকটার জন্য কখনও মানুষ বলে অভিহিত করা হয় না, বরং মানুষকে মানুষ বলা হয় এর নৈতিক গুণ-গরিমার কারণে। মানুষের একটি দেহ আছে, স্বতন্ত্র একটি সত্তা আছে, তা কতোখানি স্থান দখল করে থাকে, সে শ্বাস-প্রশ্বাস গ্রহণ করে, কিংবা বংশ বৃদ্ধি করে; কিন্তু শুধু এই কারণে মানুষ দুনিয়ার অন্যান্য বস্তু ও জন্তু হতে স্বতন্ত্র মর্যাদালাভের অধিকারী হতে পারে না। মানুষ নৈতিক গুণসম্পন্ন জীব, তার নৈতিক স্বাধীনতা ও নৈতিক দায়িত্ব রয়েছে। ঠিক এই জন্যই মানুষকে দুনিয়ার সমগ্র জীব-জন্তু ও বস্তুর উপর বিশিষ্ট মর্যাদা দান করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, মানুষকে ‘দুনিয়ার বুকে আল্লাহর খলিফা’ হওয়ার মহান মর্যাদায়ও অভিষিক্ত করা হয়েছে। অতএব মানবতার মূল প্রাণবস্তু সর্বাপেক্ষা প্রধান গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যখন মানুষের নৈতিকতা, তখন মানুষের জীবনে গঠন-ভাঙ্গন ও উন্নতি-অবনতির ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তকারী গুরুত্বও যে সেই নৈতিক চরিত্রেই রয়েছে তা কিছুতেই অস্বীকার করা যায় না। বস্তুত মানুষের উত্থান-পতনের উপর তার নৈতিক নিয়ম-বিধানের প্রত্যক্ষ প্রভাব বিদ্যমান। এই নিগূঢ় তত্ত্ব অনুধাবন করার পর আমরা যখন নৈতিক চরিত্রের গভীরতর বিশ্লেষণ করি, তখন নীতিগতভাবে এর দু’টি প্রধান দিক আমাদের সামনে উদ্ভাসিত হয় একটি হচ্ছে মৌলিক মানবীয় চরিত্র, অপরটি হচ্ছে ইসলামী নৈতিক চরিত্র।